শিল্পের জগতে প্রতিটি শিল্পীর গল্প আলাদা। কারও যাত্রা শুরু হয় সুযোগ আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে, আবার কারও শুরু হয় শুধুই ভালোবাসা, ধৈর্য এবং নিজের উপর অগাধ বিশ্বাস থেকে। Most. Mithia Tabassum সেই দ্বিতীয় ধরনের একজন শিল্পী—যিনি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা গাইডলাইন ছাড়াই নিজের চেষ্টায় ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন তার শিল্পীসত্তা।
মিথিয়া তাবাসসুম একজন আর্ট ও লাইফস্টাইল–ভিত্তিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যিনি পেইন্টিং, ক্রাফট এবং হোম ডেকরের মাধ্যমে নান্দনিক ও সৃজনশীল কাজ তৈরি করেন। তার কাজের মূল উদ্দেশ্য শুধু শিল্পচর্চা নয়; বরং শিল্পের মাধ্যমে মানুষের জীবনে সৌন্দর্য, অনুপ্রেরণা এবং ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেওয়া।
তিনি প্রফেশনালি প্রায় দুই বছর ধরে আর্ট নিয়ে কাজ করছেন, তবে তার শিল্পের প্রতি ভালোবাসা অনেক পুরোনো—যার শেকড় লুকিয়ে আছে তার শৈশবের স্মৃতিতে।
🌱 শৈশবের ছোট ছোট আঁকিবুঁকি থেকে স্বপ্নের শুরু
ছোটবেলা থেকেই মিথিয়ার আঁকাআঁকির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। খাতা, কাগজ কিংবা যে কোনো জায়গা পেলেই তিনি আঁকতে শুরু করতেন। তার কাছে আঁকাআঁকি ছিল আনন্দের জায়গা, নিজের কল্পনাকে প্রকাশ করার একটি সহজ মাধ্যম।
কিন্তু এই ভালোবাসার পথটি সবসময় সহজ ছিল না।
তার পরিবারে অনেকেই মনে করতেন যে আঁকাআঁকি শুধু সময় নষ্ট করার বিষয়, যার ভবিষ্যতে তেমন কোনো মূল্য নেই। তাই তিনি তেমন কোনো উৎসাহ বা সাপোর্ট পাননি। এমনকি কোনো আর্ট স্কুল বা প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগও তার সামনে আসেনি।
তবুও মিথিয়া নিজের স্বপ্নকে থামতে দেননি। নিজের ভালোবাসা থেকেই তিনি আঁকা চালিয়ে গেছেন। তার বিশ্বাস ছিল—যদি সত্যিই কোনো কাজ ভালোবাসা দিয়ে করা যায়, তাহলে একদিন না একদিন সেই ভালোবাসা অবশ্যই ফল দেবে।
🌟 করোনাকাল: সীমাবদ্ধতার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা
২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় পৃথিবীর অনেক কিছু থেমে গিয়েছিল। কিন্তু এই সময়টাই মিথিয়ার জীবনে একটি নতুন মোড় নিয়ে আসে।
লকডাউনের কারণে যখন ঘরে বসে অনেক সময় পাওয়া গেল, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই সময়টাকে নিজের উন্নতির জন্য ব্যবহার করবেন।
তিনি YouTube, Pinterest এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে টিউটোরিয়াল দেখে নিজে নিজে শেখা শুরু করেন।
প্রথমে তিনি পেন্সিল স্কেচ অনুশীলন করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তার আগ্রহ বাড়তে থাকে রং নিয়ে কাজ করার দিকে, বিশেষ করে এক্রিলিক পেইন্টিং।
কিন্তু এক্রিলিক রং এবং প্রয়োজনীয় আর্ট উপকরণ অনেক দামি হওয়ায় সেগুলো কিনে দেওয়া সম্ভব ছিল না।
তাই তিনি একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন—নিজের ছোট ছোট সঞ্চয় থেকে টাকা জমিয়ে নিজের জন্য রং কিনে নেন।
এই ছোট্ট কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্তই তার শিল্পযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
🖌️ নিজের চেষ্টায় গড়ে ওঠা শিল্পীসত্তা
ধীরে ধীরে মিথিয়া নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে থাকেন। প্রতিটি নতুন কাজ তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
তিনি বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে কাজ শুরু করেন—
এই বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে তিনি ধীরে ধীরে নিজের একটি স্বতন্ত্র স্টাইল তৈরি করেন। তার কাজের মধ্যে প্রকৃতি, অনুভূতি এবং কল্পনার এক সুন্দর মিশ্রণ দেখা যায়।
২০২৪ সালে তিনি “Creative Canvas” নামে একটি অনলাইন পেজ তৈরি করেন, যেখানে নিজের কাজগুলো নিয়মিত শেয়ার করতে শুরু করেন।
প্রথমে এটি ছিল শুধুই নিজের কাজ সংরক্ষণ করার একটি জায়গা। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ তার কাজ পছন্দ করতে শুরু করে এবং তিনি অর্ডারও পেতে থাকেন।
এই সময় থেকেই তার পরিবারও তার কাজের প্রতি ইতিবাচক হতে শুরু করে এবং তাকে উৎসাহ দিতে থাকে।
✨ প্রিয় আর্টওয়ার্ক: “Starry Mind”
মিথিয়ার প্রিয় কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো “Starry Mind”।
এই ছবিটি তার কল্পনা, অনুভূতি এবং চিন্তার একটি শিল্পিত প্রকাশ।
অন্যদিকে সূর্যমুখী ফুল আশা, আলো এবং ইতিবাচকতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
🚀 ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা
মিথিয়ার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো নিজেকে একজন দক্ষ এবং সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
তিনি বিশেষভাবে এক্রিলিক পেইন্টিং এবং পেন্সিল স্কেচ নিয়ে আরও গভীরভাবে কাজ করতে চান।
বিশেষ করে তিনি আগ্রহী—
তার স্বপ্ন হলো এমন কাজ তৈরি করা যা শুধু সুন্দরই নয়, বরং মানুষের মনে অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে পারে।
🤝 Art & Craft Bangladesh কমিউনিটির সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা
মিথিয়ার মতে Art & Craft Bangladesh একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সৃজনশীল কমিউনিটি।
এই গ্রুপে বিভিন্ন শিল্পীর কাজ দেখা যায়, নতুন আইডিয়া পাওয়া যায় এবং শিল্পচর্চার জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি এই কমিউনিটির বিভিন্ন আয়োজন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন। এমনকি এখানে তিনি মডারেটর হিসেবে কাজ করার সুযোগও পেয়েছেন, যা তার জন্য একটি বড় অর্জন।
🌟 নতুন শিল্পীদের জন্য তার পরামর্শ
মিথিয়া নতুন শিল্পীদের উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন—
“কারও কথা শুনে নিজের স্বপ্ন থামিও না। সাপোর্ট না থাকলেও নিজে থেকে শেখার চেষ্টা করো। নিয়মিত প্র্যাকটিস করো এবং কখনো হাল ছেড়ো না। একদিন তোমার পরিশ্রমই তোমাকে সফল করবে। পরিশ্রম ও ধৈর্যই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় শক্তি।”





0 Comments